কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৩:৪২ PM
কন্টেন্ট: পাতা
বুড়িগঙ্গা নদীঃ
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে নতুন একটি স্রোত বয়ে চলে। সেই স্রোতটির নাম হয় বুড়িগঙ্গা নদী। অনেকের মতে বুড়িগঙ্গা নদী আগে গঙ্গা নদীর মুলধারা ছিল। তবে বর্তমানে এটা ধলেশ্বরীর শাখাবিশেষ। বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ করেছিলেন বাংলার সুবাদার মুকাররম খাঁ। তার শাষণামলে শহরের যেসকল অংশ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল, সেখানে প্রতি রাতে আলোক সজ্জা করা হতো। এছাড়া নদীর বুকে অংসখ্য নৌকাতে জ্বলতো ফানুস বাতি। তখন বুড়িগঙ্গার তীরে অপরুপ সৌন্দের্য্যের সৃষ্টি হতো। ১৮০০ সালে টেইলর বুড়িগঙ্গা নদী দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন- বর্ষাকালে যখন বুড়িগঙ্গা পানিতে ভরপুর থাকে তখন দুর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো। তবে বুড়িগঙ্গার আগের ঐতিহ্য এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে দখল হয়ে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গার নদীতীর।

তুরাগ নদীঃ
গাজীপুর-টাঙ্গাইল অঞ্চলের প্রধানতম নদীর নাম তুরাগ। যমুনা নদী হতে তার উৎপত্তি। কালের বিবর্তনে যমুনার শাখা প্রথমে ধলেশ্বরী, এলাংজানি, লৌহজং, বংশী নদী সর্বশেষে তুরাগ নদী নাম ধারণ করে গাজীপুরে প্রবেশ করে যা মির্জাপুর, কালিয়াকৈর, কড্ডা, কাশিমপুর আশুলিয়া, টঙ্গী, মিরপুর হয়ে তুরাগ নামেই বুড়িগঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের হাজারও নদীর মত এ নদী কালের অতল গহবরে বিলীন হতে চলেছে। বাংলাদেশ অসংখ্য নদ-নদীর সমন্বয়ে একটি নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মপ্রাণ লক্ষাধিক মুসল্লী টঙ্গীর বিশ্ব ইস্তেমা ময়দানে জমায়েত হন। যার অবস্থানও তুরাগ নদীর তীরে। এক সময় এ তুরাগ নদীই মায়ের মত বুকে জড়িয়ে রাখত এ অঞ্চলের মানুষকে। এ নদীর পানি দিয়ে লাখ লাখ কৃষক পরিবার তাদের কৃষি জমিতে সেচ দিয়ে শস্য উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করতো। লাখ লাখ লোকের জীবন প্রবাহ এ নদীর সাথেই বয়ে চলতো। ভ্রমণপিয়াসী হাজার হাজার লোক তাদের রং বেরং-এর পানসি নিয়ে ঘুরে বেড়াত এ নদী দিয়েই। দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা এ নদীর ওপর ভরসা করে জীবিকা নির্বাহ করত। সে উত্তাল খরস্রোতা নদী তার যৌবন হারিয়ে বিলীনের পথে।
তুরাগের দুইতীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শত শত শিল্প কারখানা। শিল্প মালিকরা তাদের মিলের বর্জ্য মেশানো পানি ও বর্জ্য নদীতে ফেলে প্রতিনিয়ত নদীর পানি দূষিত করে চলেছে । শিল্প বর্জ্য মেশানো বিষাক্ত পানির কারণে নদীর মাছসহ সকল প্রকার জলজ প্রাণী মরে যাচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তীসহ আশপাশের মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মিটাতে পারছে না।
এ অঞ্চরের জেলে সম্প্রদায় নদী হাওর বিল-ঝিলে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে তারা আর পূর্বের ন্যায় মাছ ধরতে না পারায় অসহায়ভাবে জীবন যাপন করছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রখ্যাত নাবিক আর পি যাহা এক সময় জাহাজের ব্যবসায় নিয়োজিত থাকায় তিনি তার অনেক জাহাজ এ নদী দিয়ে চালনা করতেন। তুরাগ নদী ভরাটের ফলে এখন আর সে জাহাজগুলো এ নদীতে চলাচলতো দূরের কথা বড় কোন নৌকাও এ নদী দিয়ে চলতে পারে না।
যমুনা নদীর পানি যে ধলেশ্বরী নদী হয়ে তুরাগ নদীতে আসত, সে নদীর মুখে তারাকান্দি নামক স্থানে বাঁধ নির্মাণ করার ফলে এখন আর নদীতে পূর্বের ন্যায় পানি প্রবাহিত হয় না। ফলে তুরাগ নদীতে চরপড়ে নদীর অস্তিত্ব হারাতে চলেছে। নদী ভরাট হওয়ার ফলে কার্তিক/অগ্রহায়ণে নদীতে পানি থাকে না।

ধলেশ্বরী নদী:
বাংলাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি নদী। এটি যমুনা নদীর একটি শাখা। এর দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটার। টাঙ্গাইল জেলার উত্তর পশ্চিম প্রান্তে যমুনা নদী হতে ধলেশ্বরীর সূচনা। এটি এর পর দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় - উত্তরের অংশটি ধলেশ্বরী আর দক্ষিণের অংশটি কালীগঙ্গা নামে প্রবাহিত হয়। এই দুইটি শাখা নদী মানিকগঞ্জ জেলার কাছে মিলিত হয়, এবং সম্মিলিত এই ধারাটি ধলেশ্বরী নামে প্রবাহিত হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার কাছে শীতলক্ষা নদীর সাথে মিলিত হয়ে পরবর্তীকালে মেঘনা নদীতে পতিত হয়।
ধলেশ্বরী বর্তমানে যমুনার শাখা, কিন্তু প্রাচীন কালে এটি সম্ভবত পদ্মা নদীর মূল ধারা ছিলো। ১৬০০ হতে ২০০০ সালের মধ্যে পদ্মার গতিপথ ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে। ধারণা করা হয়, কোনো সময়ে পদ্মার মূল ধারাটি রামপুর-বোয়ালিয়া এলাকা ও চলন বিল এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে, পরে ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর মাধ্যমে মেঘনায় গিয়ে পড়তো। ১৮শ শতকে পদ্মার নিম্ন প্রবাহটি ছিলো আরো দক্ষিণে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মূল প্রবাহ ধলেশ্বরী হতে দক্ষিণের প্রবাহে, তথা কীর্তিনাশা নদীতে সরে যায়, যা বর্তমানে পদ্মার মূল গতিপথ।
